বেদনার সন্তানেরা
‘বাস পাওয়া গেছে, ওই যে ওইখানে।’
কথাটা একজন বলতেই অসংখ্য চোখ ঘুরে যায় তুরাগের জলের দিকে। দ্রুত বয়ে যাওয়া ঘোলা জলের যে জায়গায় এইমাত্র পৌঁছাল বড় একঝাঁক কচুরিপানা, সেদিকেই লোকটির আঙুল।
পানির নিচে কোথায় বাসটি আছে, সে কথা এক কণ্ঠ থেকে অন্য কণ্ঠে ছড়িয়ে যেতে থাকে। একজন বলে ওঠেন, ‘এইবার তাইলে লাশ পাওয়া যাইব।’
লাশ! মানুষটির কথা শুনে তাঁর দিকে চকিতে তাকান একজন। একটু কেঁপে উঠল তাঁর চোখের পাতা। শূন্যদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে থাকলেন তিনি। তারপর অনেকের মধ্যে ঘাসে বসে থাকা বিষণ্ন চেহারার এক নারীর দিকে তাকালেন। আমাদের দৃষ্টিও তাঁর চোখ অনুসরণ করে। ওই নারীর শূন্যদৃষ্টিই বলে দেয়, তিনি দুর্ঘটনা দেখতে আসা সাধারণ কেউ নন। তাঁর জীবনের গল্পে আজকের দিনটির একটি বিশেষ অর্থ আছে। আজ তিনি বেদনার সন্তান।
ইশারায় ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি বুঝে নেন। বলেন, ‘ওর ভাই। আমি আরিফুলের ভগ্নিপতি।’
‘আপনারা নিশ্চিত, বৈশাখী বাসেই ও ছিল?’
‘নিশ্চিত। আরিফুল সাভারে আমাদের বাড়িতেই যাচ্ছিল।’
‘কত ছিল ওর বয়স?’
‘বাইশ কি তেইশ। পড়ত এশিয়ান ইউনিভার্সিটিতে। পলিটিক্যাল সায়েন্সে।’
‘আপনারা কখন এসেছেন?’
‘গতকাল বিকেল থেকে আমরা এখানে অপেক্ষা করছি। একটা লাশ উঠিয়েছে দেখলাম। ওটা আরিফ নয়, ওটা আরিফের লাশ নয়।’
‘আরিফ’ আর ‘লাশ’ শব্দ দুটি একই বাক্যে উচ্চারণ করতে কি কষ্ট হয় আরিফের ভগ্নিপতি গোলাম মোস্তফার? জানতে ইচ্ছে করে, শ্যালক বেড়াতে আসবে বলে কী রান্না হচ্ছিল বাড়িতে, কত দিন পর সাভার যাচ্ছিল আরিফ। কিন্তু কিছুই জিজ্ঞেস করা হয় না। যাঁরা জলজ্যান্ত এক তরুণের প্রতীক্ষায় কাটাচ্ছিলেন রোববারের সকাল-দুপুর, যাঁরা এখন নির্জীব একটি লাশের অপেক্ষায় আছেন, তাঁদের সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ে কথা বলা যায় না।
‘লাশ না পাওয়া পর্যন্ত এখানেই থাকবেন?’
‘যাদের কেউ মারা গেছে, তারা কি লাশ না নিয়ে বাড়ি যেতে পারে? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। লাশটা পেলেই সান্ত্বনা। চাঁদপুরের মতলবের বাড়িতেও সবাই লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। ওর মা-বাবা...।’
আরিফের বোনের দিকে তাকাই। কথা বলার সাহস পাই না। শোকে কোনো সান্ত্বনা হয় না। তাঁর চোখে জল নেই। গুমোট হয়ে আছে মুখ। ঝড়ের পূর্বাভাস। আরিফ যখন ‘লাশ’ হয়ে আসবে বোনের কাছে, তখনই কি সেই ঝড় আছড়ে পড়বে বোনের অস্তিত্বে?
ঘড়ির কাঁটা একটার কাছাকাছি। আমিনবাজারের সালেপুর সেতুর দুই ধারে মানুষ আর মানুষ। সেতুর ওপর থেকে মানুষ সরিয়ে দিতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন। ভদ্রভাবেই তাঁরা বলছেন, ‘যান, ওই দিকে যান ভাই, কাজ করতে দেন ভাই, বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।’
সমবেতদের মধ্যে নারীর সংখ্যা কম নয়। দুপুরের রোদ উপেক্ষা করে সবাই অপেক্ষায়। ফিসফিস করে একজন নারী বলেন, ‘লাশ কি একটাই আসিলো?’
গম্ভীর মুখে আরেকজন বলে, ‘আরও আসবে। নিচে লোক যাইতে পারতাছে না। স্রোত।’
সেই নারী বললেন, ‘আমি যাইগা। হার্টফেল হইয়া যাইমু।’
তড়িঘড়ি তিনি চলে যান।
স্রোতের টানে বাসটি চলে গেছে নদীর কিছুটা গভীরে। এবার ডুবুরিরা ঝাঁপ দিলেন পানিতে। প্রতীক্ষা। দুটো লোহার রশি নিয়ে তাঁরা নেমেছেন। বাসের সঙ্গে যুক্ত করে উঠে আসবেন।
নদীতে অনেক নৌকা। নৌকায় অনেক মানুষ। আমরা সেতুর ওপর দাঁড়াই। সেখানেই দেখি প্রদ্যুৎ ভৌমিককে। মধ্যবয়সী ভদ্রলোক কথা বলছেন র্যাবের এক সদস্যের সঙ্গে। খবর পেয়ে ঝিনাইদহ থেকে বড় ভাই প্রশান্ত কুমার ভৌমিককে খুঁজতে এসেছেন। প্রশান্ত ঝিনাইদহে ওষুধের ব্যবসা করতেন। ঢাকায় এসেছিলেন চিকিৎসক দেখাতে। রোববার বেলা ১১টা ২৩ মিনিটে প্রদ্যুতের ছেলেকে মোবাইলে ফোন করে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ডাক্তার ওষুধ পাল্টায় দেসে, ঠিক হয়ে যাবেনে।’ এর পর থেকে তিনি আর ফোন ধরছেন না। সকালেই উঠতে চেয়েছিলেন ঝিনাইদহের বাসে। কিন্তু যাননি। পুরোনো বন্ধু আনোয়ার হোসেন সাভারে একটি জমি কিনেছেন। প্রশান্তকে সেই জমি দেখাতে নিয়ে যাচ্ছিলেন আনোয়ার। সেই যাওয়াই শেষ যাওয়া হলো তাঁদের। দুই বন্ধুর মোবাইল ফোনই এখন বন্ধ। দুই পরিবারের আলোকিত জীবনে এখন শোকের অন্ধকার।
হঠাৎ সচল হয়ে উঠল সেনাবাহিনীর ক্রেন। ভেসে এল ‘ড্রেজ বাংলা-৬২’ নামের একটি উদ্ধারযান। ডুবুরিরা উঠে এসেছেন। কিছুটা সময় কেটে যায় তার সঙ্গে লোহার রশি বাঁধার জন্য। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, দমকলবাহিনী চেষ্টা করে যাচ্ছে। প্রতীক্ষায় থাকা অগণিত মানুষ কখনো ক্ষোভে ফেটে পড়ছে, কখনো কাজের অগ্রগতিতে উল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠছে।
বিকেল চারটা আট মিনিটে ড্রেজ বাংলা-৬২-এর সঙ্গে বাসে বাঁধা রশিটি যুক্ত করা হয়। এর পর থেকে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা। উদ্ধারযান একটু এগিয়ে, একটু পিছিয়ে বাসটাকে তীরের দিকে টেনে আনার প্রাণান্ত চেষ্টা করে, কিন্তু তা যেন একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। সেতুর ওপর উঠে আসে ফায়ার ব্রিগেডের একটি গাড়ি। এখান থেকে আলো ফেলা হবে নদীতে। কাটতে চায় না প্রতীক্ষার প্রহর। এই উদ্ধারযান দিয়ে বোধহয় বাসটি তোলা সম্ভব হবে না, এমন কথাই শোনা গেল কয়েকজন উদ্ধারকর্মীর মুখে।
পড়ন্ত বেলায় মানুষ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সেতুর আশপাশে। শত শত মানুষ। সেতু পার হওয়ার সময় বাস, ট্রাক, প্রাইভেট গাড়ি থেকে সবাই তাকাতে থাকে নদের দিকে। দু-একজন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ‘লাশ পাওয়া গেছে?’
উৎসাহী মানুষ বলে ওঠে, ‘একটা লাশ পাওয়া গেছে।’
রোববার বেলা ১১টায়ও যারা ছিল মানুষ, তারা এখন লাশ। এখন স্বজনদের কেউ আর প্রিয়তম মানুষটির জন্য অপেক্ষা করছে না, অপেক্ষা করছে লাশের জন্য।

No comments:
Post a Comment